ঢাকা, শুক্রবার, আগস্ট ৬, ২০২১

শিরোনামঃ

প্রাথমিকের বিস্কুট প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে ছয় মাস

প্রাথমিকের বিস্কুট প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে ছয় মাস
স্টাফ রিপোর্টার : প্রাথমিকের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিস্কুট বিতরণ তথা ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পে’র মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ছে। তবে প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে না। প্রকল্পের উদ্ধৃত টাকা দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিকের ৩০ লাখ শিক্ষার্থীদের উচ্চপুষ্টিমানের বিস্কুট বিতরণ করা হবে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি চেয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে সম্মতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠি গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’র ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক একেএম ফজলুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘গত ১ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভার সিদ্বান্ত বাস্তবায়নে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পে’র ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রস্তাবিত মেয়াদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিকল্পনা বিভাগের এতদসংক্রান্ত পরিপত্রানুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো’।
মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হলে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির জন্য ফাইল পাঠাতে হয় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিকল্পা কমিশনে প্রস্তাব পাঠালে তা পর্যালোচনা করে অনুমোদ দেয়। এর আগে ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প’র মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর মতামতের জন্য প্রস্তাব পাঠনো হয়নি। গত ১ জুন একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’ অনুমোদন না দিয়ে ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাব দেন। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় এবং বিস্কুট বিতরণ প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়ে যায়। নতুন প্রকেল্পর ডিপিপি সংশোধন করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। এই সময়ে বিস্কুট বিতরণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী ৩০ লাখ শিক্ষার্থী অপুষ্টি ও ঝরে পড়া আশঙ্কা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) ব্যয় না বাড়িয়ে আরো এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। গত ১০ জুন প্রস্তাবটি পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিকল্পনা কমিশনে না পাঠিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সচিবকে নির্দেশ দেন। সচিব কৌশল করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতামতের জন্য ফাইল পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। একইসঙ্গে এক বছরের পরিবর্তে ছয় মাসের নতুন প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য করে ডিপিইকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হলে যৌক্তিকতা তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠাতে হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ায় সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠালে সেখানকার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা সচিবের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইলে সরাসরি টাকা পাঠাতে চেয়ে ছিলেন সচিব। হতদরিদ্র অভিভাবকদের ফোনে সরাসরি টাকা পাঠালে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। অভিভাবকরা নিজেদের প্রয়োজনে খরচ করে ফেলবেন। এর নেপথ্যে ছিল সচিবের কমিশন বাণিজ্যের ধান্ধা!
এসব বিষয়ে জানতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলামের ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের মেয়াদ ছয় মাস বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি দিয়েছেন। এখন মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।  
দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের দারিদ্রপীড়িত ১০৪টি উপজেলায় ২০১০ সাল থেকে প্রকল্পের অধীনে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ৭৫ গ্রামের এক প্যাকেট বিস্কুট বিতরণ করা হয়। বিস্কুট থেকে একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন ৩৩৮ কিলো ক্যালরি শক্তি পায়। প্রকল্পটি প্রথম দফায় ২০১০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প সংশোধন করে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১১৪২ কোটি ৭৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে জিওবি ৫৯৭ কোটি ৭০ লাখ ৫৭ হাজার ও প্রকল্প সাহায্য ৫৪৫ কোটি নয় লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
বিস্কুট বিতরণের সফলতা থেকে সারা দেশের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবার দিতে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় স্কুল মিল নীতিমাল-২০১৯। নীতিমালা অনুযায়ী ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’টি গত ১ জুন একনেকে উত্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার খিচুড়ি দেওয়ার প্রস্তাব করায় প্রধানমন্ত্রী ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশে সফর রাখায় একনেক থেকে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়তে হয় সরকারকে।
দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি গত ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’ প্রকল্পটির অনুমোদনে বিলম্বের কারণে ব্যয় না বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরেক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যাতে ঝরে না পড়ে সেজন্য চলমান প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। মহামারির মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিস্কুট বিতরণ করেন। প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত জিওবি খাতের ৪৭৩ কোটি নয় লাখ টাকা খরচ হয়নি। এ টাকা দিয়ে আগামী এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল ডিপিই।