ঢাকা, শুক্রবার, আগস্ট ৬, ২০২১

শিরোনামঃ

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে
স্টাফ রিপোর্টার : আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে নেওয়া হবে।  এছাড়া সরকারি- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক  থেকে মাধ্যমিক স্তরে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।  করোনা ভাইরাস সংক্রমন রোধে অনলাইনে আবেদন নেওয়া হবে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে অভিভাবকদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি ভেবে টিউশন বাড়ানো হয়নি। গত বছরের চেয়ে এবার ভর্তি নীতিমালায় দুটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ক্যাচমেন্ট (এলাকাভিত্তিক) কোটা ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আর ক্লাস্টারভিত্তিক লটারিতে ঢাকা মহানগরীর শিক্ষার্থীরা একটির পরিবর্তে পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। গতকাল বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তিনটি বিকল্প খতিয়ে দেখেছি। একটি হচ্ছে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্কুলে এনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি না। এমসিকিউ পদ্ধতির কথা চিন্তা করেছি, কিন্তু তাতেও শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে হত। অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সবার জন্য নিরাপদ হলেও সব শিক্ষার্থীর অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হবে, তাই এটি যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। সবার ইন্টারনেট অ্যাকসেস নেই, আবার সংযোগেও সমস্যা আছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াবার জন্য প্রতি শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যোগ্যতার চাইতে ভাগ্যকে প্রাধ্যান্য দেওয়া হচ্ছে।...বাধ্য হয়েই এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছি। অন্যবার প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে এবং দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হত। আর জেএসসি-জেডিসির ফলের ভিত্তিতে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলেও এবার অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা না হওয়ায় সে সুযোগ নেই।
আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে এবার শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার বিষয়টি হয়ত অনেকে ভাববেন যে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু ভালো করে যদি লক্ষ্য করি, তাহলে বোঝা যাবে যে প্রক্রিয়াটি যোগ্যতাভত্তিক না হয়ে ভাগ্যভিত্তিক হলেও আমাদের বিদ্যালয়গুলো সর্বোপরি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় কেবল অ্যাকাডেমিক অর্থে সব মেধাবী শিক্ষার্থী গুটি কয়েক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীভূত হয়, ফলে বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের অসাম্য তৈরি হয়। প্রচলিত ভর্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত হলে তা দূর করা অসম্ভব। একটি দেশের গুণগত শিক্ষা অর্জনে এ ধরনের অসাম্য একটি বড় বাধা।...এই পদ্ধতিতে বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কিছুটা হলেও সাম্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হব।
শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগ করে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ১১-১২ বছরের শিশুদের মেধা নিরুপণ করা যায় না। ১৬ বছরের পরে এটা করা হয়। এর আগে তা করা হলে তা যৌক্তিক ও অনৈতিক। উন্নত দেশগুলোতেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে। তাই কেউ যদি গুটিকয়েক স্কুলে ভর্তি হতে না পারলে মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছে বলে, তা ঠিক না। এটা বলা হলে তাদেরকে আবারো পরীক্ষা ও বইয়ের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে। আমাদের এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনেক সময় স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হলে স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা যাবে। আশা করি পূর্ণ স্বচ্ছতার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারব। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি ভর্তি ফি নেয়। অনেক সময় আমরা ব্যবস্থা নিই, অনেক সময় প্রমাণ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারি না। আশা করি কেউ অতিরিক্ত ফি নেবেন না, অতিরিক্ত ফি নিলে ব্যবস্থা নেব, আমরা কঠোর হব।
এসএসসির ফলকে প্রাধান্য দিয়ে এইচএসসির ফলঃ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলকে প্রাধান্য দিয়ে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল দেওয়া হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে জেএসসি-জেডিসির ফলাফলকে ২৫ এবং এসএসসির ফলকে ৭৫ শতাংশ বিবেচনায় নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের ফল ঘোষিত হবে। তবে কোন পদ্ধতিতে এবারের এইচএসসির ফল ঘোষণা করা হবে তা ফল প্রকাশের দিন বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
স্কুল খুললেও রোটেশনে ক্লাসঃ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, আগামী ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ছুটি আরো বাড়ানো হতে পারে। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে। তবে আগের মতো শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেওয়া হবে না। সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস না নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন ক্লাসে আসতে হবে শিক্ষার্থীদের। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী বছরের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস করানো হবে।
অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার সনদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নেওয়া না হলেও তাদের শিক্ষা বোর্ড থেকে পাসের সনদ দেওয়া হবে। সেই সনদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে। নিজ নিজ স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা পাসের সনদ পাবে। সেটি নিয়ে তারা নবম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে।
গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে আবারো শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বান: শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা না হলে ভর্তিচ্ছুদের বিশাল ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেকে মসজিদে রাত কাটান। আবার ছাত্রীদের সেই সুযোগও নেই। এর সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি তো রয়েছেই। আর করোনার কারণে এটা সম্ভবই নয়। সে কারণে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এ প্রক্রিয়ায় আসছে না, তাদের আবারো বিষয়টি ভেবে দেখার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছে: বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে না জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামী বছর যাদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তাদের জন্য তিন মাসে শেষ করা যায়- এমন একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে, তার আলোকে তাদের তিন মাস ক্লাস করিয়ে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে আমরা তাদের তিন মাস ক্লাস করাতে চাই। সে কারণে হয়ত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দুই/এক মাস পিছিয়ে যাবে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরির শিক্ষার্থীদের জেএসসি পরীক্ষা হয়না। তাই শুধু এসএসসির ফলেই এসব শিক্ষার্থীদের ফল দেওয়া হবে।
বেসরকারি হাইস্কুলেও অনলাইনে আবেদন : নতুন ভর্তির নীতিমালা অনুযায়ী আগামী শিক্ষাবর্ষে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে স্কুলের এন্ট্রি শ্রেণি ও আসন শূন্য থাকা সাপেক্ষে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি করা যাবে। আসনের চেয়ে আবেদন বেশি হলে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের বয়স জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী  ছয় বছর হতে হবে। বয়স নির্ধারণের জন্য ভর্তির আবেদন ফরমের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে স্কুল পরিচালনা কমিটি সভা করে লটারির সময় নির্ধারণ করবে। তবে একই ক্যাচমেন্ট এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলিত ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থানা বা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লটারির তারিখ ভিন্ন ভিন্ন সময় নির্ধারণ করবেন। লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করার সঙ্গে অপেক্ষামান তালিকা তালিকাও তৈরি করতে হবে। কোন শিক্ষার্থী ভর্তি না হলে অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি করা হবে। প্রত্যেক স্কুল নিজস্ব উদ্যেগে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এক্ষেত্রে স্কুল পরিচালনা কমিটি একাধিক উপ-কমিটি গঠন করতে পারবে। একই ক্যাচমেন্ট এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে শিক্ষার্থীরা যে কোন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবে। আর সরকারি হাইস্কুলে ক্যাচমেন্টভুক্ত এলাকার পাঁচটি স্কুলে আবেদন করা যাবে। ক্যাচমেন্ট এলাকার আগের মতোই নির্ধারিত হবে। ঢাকা মহানগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুলের ক্যাচমেন্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক আসন সংরক্ষণ করতে হবে। আগে ৪০ ভাগ সংরক্ষিত ছিল। বাকি কোটা আগের মতোই রয়েছে।
লটারির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগরিতে মাউশির মহাপরিচালক আহ্বায়ক করে ভর্তি কমিটি গঠন করতে হবে। এক কমিটির সদস্য থাকবেন ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাউশির পরিচালক (বিদ্যালয়), ঢাকা জেলার ডিসির প্রতিনিধি, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, মাউশির ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক। সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসির নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে ভর্তি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটির সদস্য হবেন-  জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী ও শিক্ষা কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ভর্তি কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটির সদস্য হবেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
বেসরকারি হাইস্কুলে ভর্তি ফরমের মূল্য চলতি শিক্ষাবর্ষের মতোই ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়ানো হয়নি। আগের মতোই রয়েছে।  ঘোষিত শূণ্য আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি  ও নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত টিউশ ফির বেশি আদয় করা যাবে না। এবার বার্ষিক পরীক্ষা না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অ্যাসেসমেন্ট শেষ হওয়ার পর শূন্য আসন ঘোষণা করে ভর্তি কমিটির কাছে তালিকা জমা দিতে হবে। কোভিড-১৯ মহামারির সংক্রমন রোধে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা সদরের পৌর শহর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও জমা  স্বশরীরে দিতে হবে না। প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে জমা দিতে পারবেন। আবেদন ফরম বিতরণের পর অন্তত সাত কার্য দিবস সময় দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ ও লটারির ফলাফল প্রকাশ করবে। ফলাফল এক বছর স্কুলে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে আবেদন ফরম জমা নেওয়ার সময়ে ফরমের নিচের অংশ ক্রমিক নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীদের ফেরত দিতে হবে। নীতিমালা লংঘন করে ভর্তি ও অতিরিক্ত ফি আদায় করলে প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলসহ কঠোর  ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।