ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২০

শিরোনামঃ

মহামারিতেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির হিড়িক

মহামারিতেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির হিড়িক
স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েই চলেছে। জুনের পর জুলাই মাসেও ‘অস্বাভাবিক’ বিক্রি হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্র।


চলতি অর্থবছরের প্রথম জুলাইয়ে মোট আট হাজার ৪৮০ কোটি ৩১ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের জুলাই মাসের ছয় হাজার ৯১ কোটি ৩৩ হাজার টাকার চেয়ে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এক মাসের হিসাবে গত জুলাই মাসের সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নয় হাজার ৭২৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে নয় হাজার ৩২৩ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে মানুষ এখন চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে। তার ওপর মুনাফায়  করের হার বৃদ্ধি এবং নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপের পরও সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই উল্লম্ফনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ধোঁয়াশায় আছেন অর্থনীতি গবেষকরা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত গণমাধ্যমকে বলেন, “সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই উল্লম্ফন সত্যিই অস্বাভাবিক। জুনের পর জুলাই মাসেও বেশি বিক্রি!”

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর  বলেন, “এই কঠিন সময়ে মানুষ টাকা পাচ্ছে কোথায়? বুঝতে পারছি না।”

তবে এর দুটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আহসান মনসুর বলেন, “প্রথমত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের একটি অংশ দিয়ে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। আগেও কিনত, তবে এখন রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় এই অঙ্ক বেড়েছে।

“এছাড়া অন্য যে কোনো সঞ্চয় প্রকল্পের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যেহেতু বেশি, সবাই এখানেই বিনিয়োগ করছে।”

সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার এখন জাতীয় পরিচয়পত্র এবং টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করেছে। তাছাড়া ব্যাংক হিসাব ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনা যায় না।

এখন আর কেউ ভুয়া নামে বা একই ব্যক্তি বিভিন্ন নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারে না বলেই সঞ্চয়পত্রের এত বিক্রি অস্বাভাবিক ঠেকছে গবেষকদের কাছে।

ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে গত কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে সরকারের ঋণের বোঝাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল।

বিক্রির চাপ কমাতে গত বছরের ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার উপর উৎসে করের হার পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একইসঙ্গে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে কমতে শুরু করে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। কিন্তু এখন তা আবার বাড়ছে।


২০২০-২১ অর্থবছরের দুই মাস (জুলাই-অগাস্ট) পার হয়ে গেলেও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর জুলাই মাসের তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়,

>> এই মাসে ৮ হাজার ৪৮০ কোটি ৩১ লাখ টাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র, ৩ হাজার ২৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

>> তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫৬০ কোটি ১৪ লাখ টাকার।

>> পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬২৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

>> পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার।

>> গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ ৫২ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা শোধ করা হয়েছে। এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

>> ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কম।

>> ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৯ হাজার ৩২২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। সুদ-আসল বাবদ গ্রাহকদের শোধ করা হয় ৫ হাজার ৯০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

>> সর্বশেষ গত জুলাই মাসে ৮ হাজার ৪৮০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। সুদ-আসল বাবদ গ্রাহকদের শোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

>> গত বছরের জুলাইয়ে মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

>> এ হিসাবেই বিক্রি বেড়েছে (প্রবৃদ্ধি) ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ।

(আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়)

সঞ্চয় অধিদপ্তর ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মোট লক্ষ্য ধরেছে ৮৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে সুদ-আসল বাবদ শোধ করতে হবে ৬৬ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার এই ২০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেবে।

>> গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ ৫২ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা শোধ করা হয়েছে। এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

>> ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে গত অর্থবছরে  আগের বছরের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কম।

>> ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে নয় হাজার ৩২২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। সুদ-আসল বাবদ গ্রাহকদের শোধ করা হয় ৫ হাজার ৯০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

>> গত জুন শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মোট স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ৬১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ ধরেছিল সরকার। বিক্রি কমায় বছরের মাঝামাঝিতে এসে সেই লক্ষ্য কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

কিন্তু জুন মাসে অস্বাভাবিক বিক্রির কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ অর্থবছর শেষে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা বাংলাদেশে লাগতে শুরু করার পর গত এপ্রিলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে নেমে আসে। ওই মাসে মোট ৬৬১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। সুদ-আসল বাবদ শোধ করা হয় তার প্রায় দ্বিগুণ এক হাজার ২৮৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। নিট বিক্রি ছিল ৬২১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ঋণাত্মক (-)।

অর্থাৎ এপ্রিল মাসে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল তার থেকে ৬২১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বেশি গ্রাহকদের সুদ-আসল বাবদে পরিশোধ করা হয়েছে।

মে মাসে তিন হাজার ২২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। সুদ-আসল বাবদ শোধ করা হয় দুই হাজার ৭৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৩০ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

গত অর্থবছরের শেষ মাসে জুনে মোট বিক্রি মে মাসের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেড়ে নয় হাজার ৩২২ কোটি ৮০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।