ঢাকা, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

শিরোনামঃ

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা হচ্ছে

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : দুই যুগ পরে আলোর মুখ দেখছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিন্ন নীতিমালা। নীতিমালাটি চূড়ান্ত করতে বুধবার শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করেছে ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন)। সবার মতামতের আলোকে নীতিমালাটি পাস হলে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে শৃঙ্খল আসবে। মানসম্মত উচ্চশিক্ষা অর্জিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। 

এ ব্যাপারে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান শিক্ষা কণ্ঠকে বলেন, অনেক দিনের সর্বোচ্চ চেষ্টার অভিন্ন নীতিমালাটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। শিক্ষার মান বজায় রাখতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে। এটা হলে চূড়ান্তভাবে শিক্ষার মান উন্নত হবে। শিক্ষকদের মধ্যে পদোন্নতি বৈষম্যও দূর হবে।

নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, থিসিসসহ বিশ্ববিদ্যলয় পর্যায়ে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদোন্নতি পেতে হলে ন্যূনতম ১০ বছরসহ মোট ২২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে সাত বছরসহ মোট ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় থাকতে হবে। পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্তদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসহ ন্যূনতম ১২ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতিতে একজন শিক্ষককে কমপক্ষে সাত বছরের ক্লাসরুম শিক্ষকতা ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম ছয় বছরসহ নয় বছরের সক্রিয় শিক্ষকতা করতে হবে। আর পিএইডি ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম চার বছর মোট সাত বছর শিক্ষকতা করতে হবে। 

সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্বীকৃত জার্নালে কমপক্ষে সাতটি গবেষণা প্রবন্ধ থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চারটি প্রকাশনা থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতি পেতে একজন শিক্ষককে ন্যূনতম তিন বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল ডিগ্রিধারীদের জন্য দুই বছর এবং পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে এক বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর স্বীকৃত কোনো জার্নালে অন্তত চারটি প্রকাশনা থাকতে হবে।

এছাড়াও বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক, বিজনেস স্টাডিজ, চারুকলা ও আইন অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোর জন্য প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী এবং সহযোগী থেকে অধ্যাপক নিয়োগে জন্য একটি অভিন্ন শর্তাবলী যোগ করা হয়েছে নীতিমালায়। একই ভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়, মেডিসিন, কৃষি ও কৃষি প্রাধান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা নিয়োগ শর্তাবলী করা হয়েছে। 

সিনিয়র অধ্যাপক থেকে গ্রেড-৩ থেকে গ্রেড-২ পেতে হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে অধ্যাপক পদে অন্তত চার বছর চাকরি এবং স্বীকৃত কোনো জার্নালে বিষয়ভিত্তিক দুটি নতুন আর্টিক্যাল প্রকাশের শর্তে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ২য় গ্রেড পাবেন। একইভাবে দ্বিতীয় গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের মোট চাকরিকাল অন্তত ২০ বছর এবং ২য় গ্রেডের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছানোর দুই বছর পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ১ম গ্রেড পাবেন। তবে এ সংখ্যা মোট অধ্যাপকের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।

বিভিন্ন বিশ্ববিদালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১১ বছরেই অধ্যাপক হয়ে যায়। কোথাও প্রভাষক পদে যোগ দিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রথম শ্রেণি বাধ্যতামূলক। আবার কোথাও যে কোনো একটিতে প্রথম শ্রেণি থাকলেই হয়। স্বায়ত্তশাসিত চারটি বড় ও পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়। অভিন্ন নীতিমালা হলে সে সুযোগ বন্ধ হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা জানান, ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেলে বৈষম্যের প্রতিবাদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের বৈঠকে তারা নিয়োগ ও পদোন্নতির বৈষম্য তুলে ধরেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি মানসম্মত অভিন্ন নীতিমালা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় ইউজিসিকে এ দায়িত্ব দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশন এ নীতিমালা চূড়ান্ত করতে বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও ইউজিসির অডিটোরিয়ামে একটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছে ইউজিসি। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ সংশ্লিষ্টরা এ কর্মশালায় উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কর্মশালার উদ্বোধন করবেন। কর্মশালার সুপারিশের পর মঞ্জুরি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পাস হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই নীতিমালাটি হলে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি জটিলতা, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমাসহ শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানও সমান নয় এবং ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য রয়েছে। বৈষম্য দূর করতে ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে নীতিমালা করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাঠায়। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক সমিতিসহ রাজনৈতিক চাপের কারণে নীতিমালা আলোর মুখেনি। এর আগে ১৯৯৩ সালে প্রথম এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০২ এবং ২০০৪ সালে অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত হয়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও আরও একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। শেষ পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। 

ইউজিসি সূত্র জানায়, নীতিমালা তৈরি করতে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. ইউসুফ আলী মোল্লাকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন- ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. শাহ নওয়াজ আলি, প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম, প্রফেসর ড. মো. আখতার হোসেন এবং ইউজিসি সচিব ড. মোহাম্মদ খালেদ। এ কমিটির সদস্য সচিব ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের পরিচালক খন্দকার হামিদুর রহমান। কমিটি দীর্ঘ সময় দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতির নীতিমালা, কমিশনের বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ফেডারেশন ও বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বসে খসড়া নীতিমালাটি তৈরি করেছে কমিটি। 

 

এ ব্যাপারে কমিটি সদস্য খন্দকার হামিদুর রহমান বলেন, খসড়া নীতিমালায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণের বিদ্যমান যে সমস্যা আছে তা দূর হবে। সবার মতামত নিয়েই এটি করা হয়েছে। আশা করি সবাই এটিকে গ্রহণ করবে। ভিসিরা কর্মশালায় তা চূড়ান্ত করবেন।